26 Jun একটা বড় একান্নবর্তী পরিবারে আমার আপন বলতে ছিল ভালোবাসার কিছু মানুষ…
একটা বড় একান্নবর্তী পরিবারে আমার আপন বলতে ছিল ভালোবাসার কিছু মানুষ, বাড়ির বাইরে একটা ছোট উঠোন, তার বাইরে এক চিলতে জমিতে মায়ের হাতে লাগানো রংবেরঙের ফুলের গাছ আর তার শেষে একটা ঝাপড়া বকুল গাছ- আমার খেলার পার্টনার। দুঃখে আমার আশ্রয়, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় ভিলেন, আনন্দে আমার সহচর, আমার অভিভাবক, আমার গোপন পরামর্শদাতা সব ভূমিকাতেই সে একইরকম স্বচ্ছন্দ। আমার সব আবদার সে মেটাতো হাসিমুখে। তার হাসি ফুল হয়ে টুপটাপ ঝরতো আমার গায়ে মাথায়।আমি কুড়িয়ে নিয়ে আসতাম। নারকেল পাতার শলায় একটার পর একটা গেঁথে তৈরি হতো পুষ্পদন্ড। নারকেল শলা বলতে মনে পড়লো- নারকেল শলার ঝাঁটার থেকে কাঠি খুলে তাকে বেঁকিয়ে দুই প্রান্তে সুতো বেঁধে ধনুক বানিয়ে আর একটা কাঠি দিয়ে যখন শরসন্ধান করতাম, তখনও প্রতিবার আমার শরের লক্ষ্যে থাকতো সেই বকুলগাছ।
তখন খেলার বেলা গেছে। উঁচু ক্লাসে পড়ি। তার সাথে আর সময় কাটানো হয়না। সেই অভিমানেই কিনা কে জানে, বকুলগাছটা একদিন মরে গেল। কদিন পর তিনটে লোক এসে তার শরীরটা টুকরো টুকরো করে নিয়ে চলে গেল। ফাঁকা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে খুব কান্না পেয়েছিল সেদিন। তখন বাড়ির সামনে দিয়ে ৯৫ নম্বর বাস যেত। আমাদের বাড়ির সামনে তার স্টপেজ ছিল। কন্ডাক্টর বাস দাঁড়ালেই গলা মোটা করে হাঁক পারতো- বকুলতলা নামবেন….। সে নেই, তার নামটুকু রয়ে গেছে। আজ এতবছর পরেও শহর থেকে ফিরে স্টেশন থেকে অটোতে উঠলে যখন চালক চিনতে পেরে বলে ওঠে- আসুন দাদা, বকুলতলা যাবেন তো? তখন কোথায় যেন একটা সারেঙ্গি কেঁদে ওঠে মারোয়ায়… আমার কান্না পায়… খুব কান্না পায়!
জীবন রোজ আমায় একটা বাসে চড়িয়ে দুনিয়া দেখায়। জানালার পাশে সরে সরে যায় কত দৃশ্য, কত ছবি। কত মানুষ ওঠে, কত মানুষ নেমে যায়! আমার স্টপেজ কোনটা কে জানে। হু হু করে ছুটে চলে বাস… হওয়া আসে জানালা দিয়ে… আমার চোখ জুড়িয়ে আসে… যাত্রীদের কোলাহল ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকে… আমি ঘুম জড়ানো গলায় বলতে থাকি- কন্ডাক্টর, বকুলতলা এলে বোলো… আমি নামবো… বকুলতলা এলে…